মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বার ২০২০ ,

প্রকাশ :০৭ জুলাই ২০২০ , ০৫:৫৫ PM

করোনা-উত্তর এক সবুজ পৃথিবীর অপেক্ষায়

single image

ছবি: সময়ের বাংলা

করোনাকালে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জীবন ও জীবিকা হুমকির মধ্যে পড়েছে। ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণ গেছে। এখনো ব্যবসায়-বাণিজ্য পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। কোনো কোনো দেশ শক্ত হাতে জীবন বাঁচানোর কৌশল গ্রহণ করে জীবিকা সংরক্ষণেও ভালো ফল পেয়েছে। চীন, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, জার্মানি ও ভারতের কেরালা রাজ্যে এই কৌশল গ্রহণ করে তারা ‘স্বাস্থ্য সুফল’ পেতে শুরু করেছে। আমরাও শুরু থেকে বলে আসছিলাম, আসুন আগে জীবন বাঁচাই। মানুষ বাঁচলে তবেই না অর্থনীতি। এ কথাও ঠিক, নীতিনির্ধারকদের নানা টানাপোড়েনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায় বাদে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনা ঐতিহাসিকভাবেই ছিল ভঙ্গুর। সক্ষমতারও অভাব ছিল। উল্লিখিত দেশগুলোয় লকডাউন অনেকটাই কারফিউর মতো ছিল। সঙ্গে ছিল সুনির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা। আর ছিল পরীক্ষা ও পরবর্তী বিচ্ছিন্নকরণ ও চিকিত্সা। আমরা সব দিক রক্ষা করতে গিয়ে হয়তো এই নীতি-কৌশলের ধারাবাহিকতা পুরোপুরি রক্ষা করতে পারিনি। 

অন্তত সচেতনতার দিকটাই নজর দিলে পরিস্থিতি এমন নাজুক হতো না বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তবে আমাদের দুর্বলতা থেকেও আমরা শিখছি। তাই এই মুহূর্তে কৃষি, খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনাসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখা সম্ভব হবে। নিঃসন্দেহে কৃষি এবারও ভালো করেছে। তাই খাদ্য সরবরাহ নিয়ে সরকারকে তত ভাবতে হচ্ছে না। গ্রামে ছোটখাটো অনেক কৃষি ও অকৃষি উদ্যোক্তার হাতে ঠিকমতো অর্থ দিতে পারলে তারা অভ্যন্তরীণ চাহিদার ধারাটি বজায় রাখতে সক্ষম হবেন। আয়-রোজগার নেই বলে অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। সেখানকার অর্থনীতিও বেশ খানিকটা সচল। সে কারণেই সুনির্দিষ্ট টার্গেট ধরে গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য তৈরি প্রণোদনা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরেকটু তত্পর হতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে কারা টাকা পেলেন, কতটা ব্যবহার করলেন, আরো চাহিদা কত—এমন ধারার মনিটরিং খুবই সহজ। আশা করছি, দ্রুতই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন মনিটরিং ব্যবস্থা দাঁড় করিয়ে ফেলবে এবং আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি গ্রামীণ অর্থনীতিকে কাঙ্ক্ষিত সহায়তা দিতে পারবে। তবে বড় উদ্যোক্তা তথা শিল্প ইউনিটের (বিশেষ করে যারা খেলাপি নন) পক্ষ থেকে এই মুহূর্তে অর্থ উত্তোলনের গতি খুব একটা জোরদার হবে বলে হয় না। বাজারে চাহিদা বাড়লেই তাদের সক্রিয় হতে দেখা যাবে। তবে যারা নিয়মিত ইচ্ছাকৃত খেলাপি তারা হয়তো এই অর্থ পেতে খুবই তত্পর হবেন। কেননা তারা ঋণ নিতে যতটা তোড়জোড় করেন তা ফেরত দেওয়ার সময় ঠিক ততটাই নির্লিপ্ত থাকেন। অথচ ভালো উদ্যোক্তাদের এই সময়টায় আর্থিক প্রণোদনা দেওয়াটা খুবই জরুরি। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ দারুণ হারে কমে গেছে। ব্যক্তিখাতের ঋণের হারই তার প্রমাণ। কর্মসংস্থান বাড়াতে চাইলে এদের পাশে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। ব্যাংকগুলোকে আশ্বস্ত করার জন্য দ্রুত ক্রেডিট গ্রান্টি স্কিম চালু করা দরকার। শুধু বাংলাদেশ কেন, সারা বিশ্বেই ব্যাপক হারে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ (গড়ে) এমন প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। কোনো কোনো দেশ জিডিপির ২০-৩০ শতাংশ প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন সরকার, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী এত অর্থ বিতরণের এই বিশাল সুযোগকে চাইলে টেকসই উন্নয়নের এক মাইলস্টোনে পরিণত করতে পারেন। এই মহামারির মধ্যেও তারা এমনভাবে এই প্রণোদনাকে সাজাতে পারেন, যাতে করে জলবায়ুসহিষ্ণু টেকসই-অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়। সবুজ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। পরিবেশ সংরক্ষরণে আরো এক পা হাঁটা যায়। নেতৃত্বের এই সবুজ মনোযোগেই গড়ে উঠতে পারে এক নয়া সবুজ পৃথিবী। এটা শুধু নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন নয়। এটা ভালো অর্থনীতিরও প্রশ্ন।

করোনা সংকট এমন এক সময়ে এলো, যখন আমরা জলবায়ুসহিষ্ণু উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে এক অভাবনীয় বিশ্ব-ঐকমত্যে পৌঁছে গিয়েছিলাম। অন্তত ৭৫ ট্রিলিয়ন টেকসই বিনিয়োগ করে প্যারিস চুক্তিকে কার্যকরী করার জন্য সরকার, ব্যক্তিখাত ও বেসরকারি খাত এক যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাত্ করে এই করোনা ভাইরাসের আক্রমণের কারণে এই পরিমাণ অর্থ সবুজায়নের স্বার্থে সমাবেশ করা সত্যি কঠিন হবে। বিশেষ করে বিদেশি ঋণে জর্জরিত উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে দ্রুত জীবন ও জীবিকা পুনরুদ্ধারের সময় এই সবুজ অর্থায়ন প্রাপ্তি অনেকটাই অনিশ্চিত হওয়ার পথে। তা সত্ত্বেও, আমাদের মতো দেশগুলো যেন টেকসই উত্পাদন ও ভোগের দিকে দৃষ্টি বজায় রাখে, সে আশাই করছি। বিশেষ করে, কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক জ্বালানি থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে সবুজ জ্বালানি উত্পাদন ও ব্যবহারে আমাদের সবাইকেই উদেযাগী হওয়ার এটিই শ্রেষ্ঠ সময়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার মতো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণে অনেক নীতিনির্ধারকই দ্বিধান্বিত থাকতেই পারেন। তবুও আমাদের সবুজ পথে হাঁটতেই হবে। তাই সামাজিক ও পরিবেশের ক্ষতি হয়, এমন বিনিয়োগে আমরা উত্সাহ দেখাতে পারি না। ২০০৮-২০০৯-এর বিশ্ব আর্থিক মন্দা মোকাবিলার সময় বাংলাদেশ যথেষ্ট কৌশলী মনোভাব দেখিয়েছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ আমরা সেই সময়ই নিয়েছিলাম। সৌরবিদ্যুত্, বায়ো-গ্যাস, জৈব সার, সবুজ গার্মেন্টস, সবুজ গৃহনির্মাণের জন্য টেকসই অর্থায়নের ‘স্মার্ট’ রেগুলেশন ও পুনঃ অর্থায়নের সুযোগ সবার আগে বাংলাদেশই শুরু করেছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশ ‘শ্রেডা’ নামের একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, যার কাজই হলো সবুজ জ্বালানি উত্পাদনের জন্য সহায়ক নীতি তৈরি করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগটিও নানামাত্রিক নিয়মনীতি তৈরি করে ব্যাংকগুলোকে উত্সাহ ও পুনঃ অর্থায়ন দিয়ে যাচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইডকল সৌরশক্তি প্রসারে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছে। এনজিও ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা হোম সোলার সিস্টেম, সৌর সেচ প্রকল্প ও রুফটপ সোলার সলিউশন কর্মসূচিতে ব্যাপক হারে অংশগ্রহণ করছে। দূরাঞ্চলে সোলার মিনিগ্রিড গড়ে তুলেছে। সবুজ বিদ্যুত্ উত্পাদন ও বিতরণে সরকারি ও বেসরকারি খাত হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন তহবিল থেকে অনেক কারখানাকেই সবুজ উত্পাদন ইউনিটে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। এছাড়া ছোটখাটো উদ্যোক্তাদের জন্য রয়েছে সবুজ ইট, ইটিপি, জৈব সারসহ নানা উদ্যোগে অর্থায়নের সুযোগ।

এই অভিজ্ঞতার আলোকেই আমরা সবুজ উন্নয়নের জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করতে পারি :

এক. সবুজ পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে যেসব উদ্যোগ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, জ্বালানিসাশ্রয়ী হয়ে কার্বন কমানোর অর্থনীতি গড়তে সাহায্য করবে—তাদের প্রণোদনার অর্থ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া হোক।

দুই. যারা করোনা-উত্তর বিনিয়োগে জলবায়ুসহিষ্ণু প্রযুক্তি ব্যবহারে উত্সাহী হবে এবং কার্বন নির্গমন কমিয়ে আনার অঙ্গীকার করবে তাদেরই প্রণোদনা প্রদানের সময় বাড়তি সমর্থন দেওয়া হোক।

তিন. সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে সবুজ বিদ্যুত্ উত্পাদনের সৃজনশীল উদ্যোগকে বেশি বেশি উত্সাহ দেওয়া হোক।

চার. ‘নেট মিটারিং’-এর মাধ্যমে এমন রাজস্ব ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে যে মানুষ স্ব-উদ্যোগে সবুজ বিদ্যুত্ তৈরি করে। ন্যাশনাল গ্রিডে আমি বিদ্যুত্ দিলে তার ইউনিট দর আমি যে দামে কিনি তার চেয়ে অন্তত ২০ শতাংশ বেশি হতে পারে।

পাঁচ. সরকার নিজেই সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদনের বড় প্ল্যান্ট গড়ে তোলার যে উদ্যোগ সম্প্রতি নিয়েছে সেই ধারাকে আরো বেগবান করতে হবে।

ছয়. ইডকলের ‘রুফটপ সোলার সলিশন’ কর্মসূচিতে আরো বেশি অর্থ দিতে হবে।

সাত. কানাডার প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো ৭৫০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, যার উদ্দেশ্য হবে জলবায়ুসহিষ্ণু বিদ্যুত্সাশ্রয়ী এবং সবুজ বিদ্যুত্ উত্পাদনকে উত্সাহ দেওয়া। আমরাও তেমন একটি বিশেষ সবুজ তহবিল গড়তে পারি।

আট. এই মহামারিকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে আমরা আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থানসহ সকল কর্মসূচিকে টেকসই করার কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার অঙ্গীকার করতে পারি। ভবিষ্যতে যাতে এমন দুর্যোগ দেশবাসীকে কাবু না করতে পারে সেজন্য আমাদের জনস্বাস্থ্যসহ পুরো উন্নয়নের ধারাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করার ক্ষেত্রে দৃঢ়প্রত্যয়ী হতে হবে।

নয়. জলবায়ু অভিযোজনে বাংলাদেশের সাফল্য অনেক। চলমান প্রণোদনা কর্মসূচিকে আমাদের এই সাফল্যকে আরো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য ব্যবহার করতে পারি।

দশ. উপকূলের ঘরবাড়ি এমন শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারি, যাতে এসব মিনি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। তাছাড়া উপকূলে সৌর ‘ডি-সেলাইনেজন প্ল্যান্ট’, জনস্বাস্থ্য কাঠামোর উন্নয়ন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বন ও পাহাড় সংরক্ষণমূলক কর্মসূচি গ্রহণেও এই প্রণোদনার অংশ বিশেষ ব্যবহার করতে পারি।

এগারো. এই মহামারি থেকেই আমরা শিখছি কী করে ঘরে বসে অফিস করা যায়। ব্যক্তিগত গাড়ি কম ব্যবহার করা যায়। প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যায়। এও শিখছি যে কী করে ই-কমার্স ব্যবহার করে কৃষি পণ্য বিক্রয় করা যায়। কৃষি সরবরাহ চেইনকে সংক্ষিপ্ত করা যায়। নতুন নতুন ‘স্টার্টআপ’ চালু করা যায়।

সবশেষে বলতে পারি, সাময়িকভাবে ‘গ্রিন হাউজ গ্যাস’ উত্পাদন ২৫ শতাংশ কমে গেলেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুরু হলে যেন আমরা এই সংকটকালের সব কথা ভুলে না যাই। আমাদের জীবন ও জীবিকাকে আরো সবুজ করার যে শিক্ষা প্রকৃতি আমাদের এবারে দিল, তা যেন ভুলে না যাই। আসলেই আমরা করোনা-উত্তর এক সবুজ পৃথিবীর অপেক্ষায় আছি।

লেখক :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

এই বিভাগের আরো খবর ::

Image

নামাজের সময়সূচী

সূর্যোদয় ভোর ৫ : ৪০ টা
ফজর ভোর ৬ : ০০ টা
যোহর দুপুর ১: ০০ টা
আছর বিকাল ৪ : ৩০ টা
মাগরিব সন্ধা ৬ : ৩০ টা
এশা রাত ৮ : ১৫ টা
সূর্যাস্ত সন্ধ্যা ৬ : ০০

অনলাইন জরিপ

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘সিটি নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয় জেনেই বিএনপি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে।’ আপনি কি তা-ই মনে করেন?